শিশুদের মনরোগ Attention deficit hyperactive disorder -ADHD

96 0
শিশুদের মনরোগ Attention deficit hyperactive disorder -ADHD

সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বের মনোবিজ্ঞানীদের কাছে ADHD / Attention deficit hyperactive disorder রোগটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মূলত এটি বাচ্চাদের একটি বংশগত মানসিক রোগ। ২০১২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীতে ৬৪ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় না হবার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই রোগের লক্ষণসমূহ দেখা যায়।

ADHD তে মানুষের ব্রেনে ডোপামিন রিসেপ্টর (receptor) এর সংখ্যা কমে যায়। যার কারণে ডোপামিন ঠিক মত কাজ করতে পারে না। ডোপামিন ব্রেনের এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ যা আমাদেরকে আনন্দ ও সাফল্যের অনুভূতি দেয়, আমাদের কোন বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ADHD এর ক্ষেত্রে ডোপামিন কাজ না করার জন্য প্রধানত ৩ প্রকারের মানসিক সমস্যা হয়ে থাকে-
১. অমোনযোগিতা।
২. অতি মাত্রায় সক্রিয়তা।
৩. ঝোঁকের বসে কাজ করা।

যে সকল জিন ডোপামিন রিসেপ্টর তৈরী করে তাদের পরিবর্তন বা মিউটেশনের কারণে ADHD হয়। তবে কেন জিনের এই পরিবর্তন হয় তার কারণ এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। মাতৃকালীন ধূমপান, মদ্যপান, মাদক গ্রহণকে অনেকক্ষেত্রে এর কারণ হিসাবে ধরা হয়। ছেলেদের থেকে মেয়েরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। ADHD আক্রান্ত বাচ্চার ক্ষেত্রে তার আপন ভাই-বোনের এই রোগ হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

● স্কুলের ক্লাসে অমনোযোগী হওয়া।
● খাতায় লেখার সময় সহজ ভুল করা।
● একটা কাজের মধ্যে হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হওয়া বা অন্যদিকে মনোযোগ দেয়া।
● কথা না শুনে হঠাৎ অন্য দিকে তাকিয়ে থাকা।
● স্কুলে পেন্সিল, রাবার, খাতা প্রায়ই হারিয়ে ফেলা।
● নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে না রাখতে পারা।
● ক্লাসের মধ্যেই উঠে বের হয়ে যাওয়া বা ছটফট করা।
● অনবরত কথা বলা।
● সবসময় অস্থিরতা ভাব, হাত পা নাড়ানো।
● একটা কাজে অনেক সময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, দ্রুত খেই হারায়ে ফেলা।
● অন্যকে কোন কাজ করতে দেখলে তখনই তাতে আগ্রহ দেখানো।

উপরের এই লক্ষনগুলোর মধ্যে ৬ টি বা তার বেশি লক্ষণ যদি ৬-১২ বছরের বাচ্চার মধ্যে দেখা যায় তাহলে অবশ্যই পরবর্তী পরীক্ষার জন্য মনোচিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য কোন রোগ নয়। কিন্তু আচরণগত পরিবর্তন, উপযুক্ত শিক্ষা ও ঔষধের মাধ্যমে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আর আচরণ পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হল শিশুকাল। তাই যত তাড়াতাড়ি এই রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করা যায় ততই ভালো ফলাফল আশা করা যায়।

ADHD এর চিকিৎসা প্রধানত ৩ ধরণের হয়ে থাকে –
১. আচরণ পরিবর্তনের শিক্ষা
২. পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা
৩. ঔষধের মাধ্যমে

আচরণ পরিবর্তনের শিক্ষা ADHD এর সবচেয়ে ভালো ও সফল চিকিৎসা। যেহেতু ADHD আক্রান্ত বাচ্চারা তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, দ্রুত সবকিছু ভুলে যায় তাই তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে রুটিন মেনে চলা, দিনের কাজগুলোকে খাতায় লিখে রাখা, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা অন্যতম। এর মাধ্যমে বাচ্চাদের সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হলেও অনেকখানি কমে যায়।

পরিবারের সদস্য বিশেষ করে মা-বাবার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চাদেরকে রুটিন করে দেয়া, রুটিন মত কাজ করলে প্রশংসা করা বা উপহার দেয়া, বারবার কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়া, বাচ্চার প্রতিটি জিনিস সুনির্দিষ্ট একটা স্থানে রাখা – এই কাজগুলো মা-বাবা কেই করতে হয়। একটা কথা সবসময় মাথায় রাখতে হবে, ADHD এ আক্রান্ত বাচ্চারা বাইরে অনেক তিরস্কার ও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, সকলেই তাদেরকে এড়িয়ে চলতে চায়। এ অবস্থায় মা-বাবার সাহায্য ছাড়া তাদের জীবন অনেক কঠিন হয়ে পরে।

ADHD এর চিকিৎসায় ঔষধ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ডেক্সট্রো-এমফিটামিন বা মেথ-এমফিটামিন জাতীয় ঔষধ ব্রেনে ডোপামিনের পরিমাণকে বাড়াতে সাহায্য করে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এইসব ঔষধ গ্রহণ করা কখনোই উচিত না কারণ এই ঔষধগুলোর মাত্রাতিক্ত ব্যবহার নেশার উদ্রেক করে।

সম্প্ৰতি এক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, ADHD এ আক্রান্ত বাচ্চারা সাধারণ বাচ্চাদের থেকে অনেক বেশি সৃজনশীল হয়। দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন এবং পরিবারের মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় এই বাচ্চাগুলোও অন্য আর দশটা বাচ্চার মত আনন্দময় শৈশব পেতে পারে। আর এর জন্য শুধুমাত্র প্রয়োজন সকলের সচেতনতার।

Leave a Reply